সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন
২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি, লেখক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। ধ্রুপদি সাহিত্য ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ সৃষ্টির জন্য তাঁকে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।নোবেল কমিটির মূল্যায়নে, কারসনের সাহিত্যকর্ম সাহসী ও উদ্ভাবনী। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, আধুনিক কবিতা, অনুবাদ, প্রবন্ধ ও বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমকে নিজস্ব সৃজনশীলতার মাধ্যমে একসূত্রে যুক্ত করেছেন তিনি। তাঁর লেখায় ধ্রুপদি সাহিত্য ও সমকালীন জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি স্বতন্ত্র সংলাপ তৈরি হয়েছে।১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্ম অ্যান কারসনের। কবিতা ও সৃজনশীল লেখালেখির পাশাপাশি শিক্ষকতা এবং প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণাতেও দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন তিনি। ক্লাসিকস বিষয়ে তাঁর একাডেমিক কাজ পরবর্তী সাহিত্যচর্চায়ও গভীর প্রভাব ফেলেছে।প্রাচীন গ্রিক ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি কারসনের আগ্রহ তাঁর অনুবাদ ও সৃজনশীল রচনায় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশ নিয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ইফ নট, উইন্টার’। সোফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ ও ‘অ্যান্টিগনি’ এবং ইউরিপিদিসের ‘বাকখাই’-এর অনুবাদও তাঁর সাহিত্যকর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।কারসনের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি প্রচলিত সাহিত্যিক শ্রেণিবিভাগের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, গবেষণা ও শিল্পের নানা রূপকে একত্র করে তিনি নিজস্ব আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন।১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ গ্রন্থে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও দূরত্বের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ বিশেষভাবে আলোচিত হয়। গ্রিক সাহিত্যের একটি শব্দ ও তার অর্থের বিভিন্ন স্তরকে কেন্দ্র করে তিনি প্রেমের আনন্দ ও বেদনার দ্বৈত অনুভূতিকে তুলে ধরেন।১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: অ্যা নভেল ইন ভার্স’ তাঁর বহুল পরিচিত কাজগুলোর একটি। প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের পৌরাণিক চরিত্র জেরিয়নকে আধুনিক এক তরুণের রূপ দিয়ে কারসন প্রাচীন পুরাণের সঙ্গে প্রেম, পরিচয় ও মানবিক সম্পর্কের সমকালীন অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করেছেন।১৯৯৫ সালের ‘দ্য গ্লাস এসে’ গ্রন্থেও তাঁর ভিন্নধর্মী সাহিত্যিক নির্মাণ দেখা যায়। দুঃখ, বিচ্ছেদ ও একাকীত্বের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এখানে কবিতা, গদ্য ও প্রবন্ধের প্রচলিত সীমারেখা অনেকটাই ভেঙে দিয়েছেন তিনি।২০১০ সালে প্রকাশিত ‘নক্স’ বইটিও কারসনের পরীক্ষামূলক সাহিত্যচর্চার অন্যতম উদাহরণ। মৃত ভাই মাইকেলের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে তৈরি এই শিল্পকর্মে ছবি, চিঠি ও বিভিন্ন ধরনের লেখা একত্র করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে রোমান কবি ক্যাটুলাসের ভাইকে নিয়ে লেখা একটি কবিতার অনুবাদ।২০১৬ সালের ‘ফ্লোট’ গ্রন্থে ২২টি ছোট বইকে একত্র করা হয়, যেগুলো পাঠক ইচ্ছামতো বিভিন্ন ক্রমে পড়তে পারেন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নর্মা’তেও বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যিক রচনার সমন্বয় দেখা যায়। সাহিত্যের পাশাপাশি চিত্রশিল্পী, কোরিওগ্রাফার, অপেরা ও থিয়েটার নির্মাতাদের সঙ্গেও কাজ করেছেন কারসন।নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান অ্যান্ডার্স ওলসনের মূল্যায়নে, কারসনের সাহিত্যকর্ম কবিতা, প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য এবং বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের মধ্যে নতুন সম্পর্ক তৈরি করেছে। তাঁর স্বাধীন ও পরীক্ষামূলক লেখার ধরনই সমকালীন আন্তর্জাতিক সাহিত্যে তাঁকে স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে।এর আগে ২০২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। নোবেল কর্তৃপক্ষ তাঁর পুরস্কারের কারণ হিসেবে অ্যাপোক্যালিপ্টিক আতঙ্কের মধ্যেও শিল্পের শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী গভীর ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাহিত্যকর্মের কথা উল্লেখ করেছিল।চলতি বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণার ধারাবাহিকতায় শুক্রবার শান্তিতে পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা হবে মঙ্গলবার।নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে বিজয়ীকে একটি ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং পুরস্কারের অর্থ দেওয়া হয়। ১৯০১ সাল থেকে আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছা অনুযায়ী মানবতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ পুরস্কার দেওয়া হয়ে আসছে।