পাচার করা টাকা ফিরবে দেশে


 দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অ্যাটর্নি জেনারেলকে আহ্বায়ক করে ১৪ সদস্যের কমিটি গঠন করে গতকাল রবিবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।


জানা গেছে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ অনুযায়ী বিদেশে পাচার করা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে গঠিত কমিটি। পাচার করা সম্পদ উদ্ধারে দায়ের মামলার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা দূর করার উদ্যোগ নেবে। এ বিষয়ে বিদেশি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয় করবে।


কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান কর্মকর্তা, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক, দুদকের মহাপরিচালক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের মহাপরিচালক, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের উপ-প্রধান কর্মকর্তা। প্রয়োজন কমিটি নতুন সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।



 

গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটি বলছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। এসব টাকা পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ডসহ ১০ দেশে। আমদানি-রপ্তানিসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কারসাজি আর হুন্ডির আড়ালে অর্থপাচার করছে পাচারকারী সিন্ডিকেট।


অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ২৬ মে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে জানান, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এবারের বাজেটে ট্যাক্স পরিশোধের মাধ্যমে পাচার করা টাকা বৈধ উপায়ে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ এবং পাচারকারীদের সাধারণ ক্ষমার


আওতায় নিয়ে আসা হবে। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এখান থেকে যারা টাকা নিয়ে গেছে, তারা সুযোগটি কাজে লাগাবে। তাদের জন্য এটি অত্যন্ত ভালো একটি সুযোগ।


মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশে তো এ সুযোগ অনেকে নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় যখন এমন একটি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করল, তখন অনেক টাকা বিদেশ থেকে ফেরত এসেছে। আমাদের সমস্ত দিক থেকেই চেষ্টা করতে হবে। যেসব টাকা বিভিন্ন চ্যানেলে চলে গেছে, সেগুলো ফেরত আনার জন্য এ উদ্যোগ।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা খুবই জটিল প্রক্রিয়া। মূলত দুই প্রক্রিয়ায় পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, অর্থ পাচারের ব্যাপারে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেতে হবে। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের আদালতে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলা করতে হবে। স্থানীয় আদালতে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পক্ষে রায় দিতে হবে। আদালতের এ রায়ের কপি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে যে দেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে ওই দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে জানাতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস অর্থ ফেরত দেওয়া যায় কিনা তা নিয়ে ওই দেশের আদালতে মামলা করবে। সংশ্লিষ্ট দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে আইনি জটিলতা রয়েছে কিনা তা যাচাই বাছাই করবে। আইনি জটিলতা না থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত থেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে রায় দেবে। এর পরই কেবল পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।


দ্বিতীয়ত, মামলা করা ছাড়াও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা যায়, যদি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কোনো জটিলতা না থাকে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থা এগমন্ড গ্রুপের সদস্য হবে হবে। যেমন বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র এগমন্ড গ্রুপের সদস্য। এক্ষেত্রে এক দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকে অন্য দেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পাসপোর্ট নম্বরসহ সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করবে। ওই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য যাচাই-বাছাই করবে। যাচাই-বাছাইয়ে তথ্যের গরমিল না পেলেই কেবল পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও কয়েক বছর লেগে যাবে।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.